আইলার এক যুগ: এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি ক্ষতিগ্রস্তরা

0
44

ভয়ংকর আইলার আঘাতের পর একযুগ পার হলেও রয়ে গেছে তার ক্ষতচিহ্ন। এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি ক্ষতিগ্রস্ত শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর ও আশাশুনির প্রতাপনগরের মানুষ। তাদের রাস্তা নির্মাণ হয়েছে, নতুন ঘর তৈরি হয়েছে। কিন্তু এলাকায় কৃষিকাজ নেই, চিংড়ি চাষেও মন্দা।  কর্মসংস্থান না থাকায় এসব এলাকার লক্ষাধিক মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে চলে গেছেন বিভিন্ন জেলায়। আইলার পরেও ফণি, বুলবুল, আমফানের মতো ঝড়ের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হওয়া সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ইয়াশ আঘাত হানতে পারে– এ আশঙ্কায় ওইসব জনপদে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

শ্যামনগর উপজেলার চারিধারে নদীবেষ্টিত গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, ২০০৯-এর এই দিনে মাত্র তিরিশ মিনিটের তাণ্ডব বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দুটি ইউনিয়ন গাবুরা ও পদ্মপুকুর। এছাড়াও বিধ্বস্ত হয় আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। ৩৬টি গ্রামের ৭৩টি জীবন মুহূর্তেই কেড়ে নিয়েছিল আইলা। নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হওয়ায় গৃহহীন হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল সড়কের ধারে ও উঁচু স্থানে। টানা দুই বছর তারা সেখানে কাটিয়ে অবশেষে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ঘরবাড়ি পেয়েছেন তারা। কিন্তু এলাকায় কাজ না থাকা আর বারবার দুর্যোগের মুখে বসতি টিকছে না তাদের। কাজের খোঁজে বেরিয়ে যাচ্ছেন দুর্গত মানুষ। স্বাস্থ্যসেবার নাজুক অবস্থা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে। বেড়িবাঁধগুলোর অবস্থা নাজুক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়েছে নানা সমস্যা। সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট। রমজান মাসে তীব্র গরমে মানুষকে লবণাক্ত পানি পান করতে হয়েছে। সুপেয় পানির জন্য বরাদ্দ জেলা পরিষদের পুকুরগুলো গত বছরের আমফানে ভেসে যাওয়ায় আজও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি।
গাবুরা ইউনিয়নের খলিষাবুনিয়া গ্রামের কৃষিজীবী আবু বক্কর ছিদ্দিক জানান, ২০০৯ সালে আইলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। সরকারিভাবে বাঁধ মেরামত করা হলেও তা মজবুত না হওয়ায় প্রতি জোয়ারে তাদের আতঙ্কে থাকতে হয়। ঘূর্ণিঝড় আমফানের ভয়ে অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। তারা ত্রাণ চান না, বেড়িবাঁধ চান।

চকবারা গ্রামের মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘আইলার আগে তাদের কৃষিজমি ছিল পাঁচ বিঘা। আইলা ও আমফানের পর চাষবাস নেই, কাজ নেই। এখন সবই চিংড়ি ঘের। রাস্তাঘাটও ঝুঁকিপূর্ণ।’ ছয় মাস তিনি ইটভাটায় কাজ করেন। আর ছয় মাস বাড়িতে এসে কর্মহীন হয়ে অলস সময় পার করেন।

ডুমুরিয়া গ্রামের সাইফুল ইসলাম, পাখিমারা গ্রামের ছখিনা বেগম ও গৃহবধূ রিজিয়া বেগম বলেন, ‘সাতক্ষীরার ছোট দ্বীপ গাবুরা। আইলার পর থেকে দূর থেকে পানি আনতে হয়। লবণপানি সহ্য করতে না পেরে ডায়রিয়া হয়। দূষিত পানিতে ঘা-পচড়াসহ নানান চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। ডাক্তার নেই, নার্স নেই। ডাক্তার দেখাতে অনেক দূরে শ্যামনগরে যেতে হয়। রাস্তা ভালো না হওয়ায় রোগী আধমরা হয়ে যায়।’

সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ডালিম কুমার ঘরামি বলেন, ‘২০০৯ সালে আইলা পরবর্তী সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে তেমন কোনও উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। সাধারণ হতদরিদ্র মানুষ বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকা, খুলনা ও যশোরে গিয়ে রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক চালিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। এ এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়নি। চিকিৎসার জন্য ২৫ কিলোমিটার দূরে শ্যামনগরে যেতে হয়। বেড়িবাঁধের অবস্থা খারাপ। কয়েকবার মন্ত্রী এসেছেন, সে অনুযায়ী কাজ হয়নি। সাধারণ মানুষ সুপেয় পানির জন্য হাহাকার করছেন।’

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাস আইলার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় উপকূলীয় এলাকা। ১৫ ফুট উচ্চতায় ধেঁয়ে আসা জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে সুন্দরবন উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায়। ৭৩ নিহত হন এবং নিমিষেই গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। ধ্বংস হয়ে যায় উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধ আর ভেঙে যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে ২০১৯ সালের ৪ মে ফণি এবং ২০২০ সালের ২০ মে আম্পানের আঘাতে আবারও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় এলাকার লোকজন।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here