মৌলভীবাজার শহরের শমশেরনগর রোডে ব্যবসায়ী শাহ ফয়জুর রহমান রুবেল হত্যার ঘটনায় মূল আসামি জুহেল মিয়া ওরফে জুয়েল ওরফে আলিফ (২২) পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে। পুলিশ তার কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ধারালো ছুরি, মাস্ক, জুতা, রক্তমাখা টাকা এবং অন্যান্য আলামত উদ্ধার করেছে।
গত ৭ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে শমশেরনগর রোডের সিএনজি স্ট্যান্ড সংলগ্ন এফ রহমান ট্রেডিং নামের হার্ডওয়ার ও স্টেশনারি দোকানে প্রবেশ করে দোকান মালিক শাহ ফয়জুর রহমান রুবেল (৫৫)-কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতাল হয়ে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে ৯ আগস্ট মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নং-১৮, ধারা ৩০২/৩৪ পেনাল কোড)।
ভিকটিম শাহ ফয়জুর রহমান রুবেল মৌলভীবাজার শহরের শ্যামলী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। তিনি কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের মৃত শাহ আব্দুল গফুর ও মৃত মালেকা বেগমের সন্তান। শমশেরনগর রোডের সিএনজি স্ট্যান্ড এলাকায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে “এফ রহমান ট্রেডিং” নামে হার্ডওয়ার ও স্টেশনারি দোকান পরিচালনা করে আসছিলেন।
ঘটনার পর পুলিশ সুপার এম. কে. এইচ. জাহাঙ্গীর হোসেন পিপিএম-সেবা’র নির্দেশে তদন্তে নেমে একাধিক টিম গঠন করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা, সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল খায়ের, সদর থানার ওসি গাজী মাহবুবুর রহমান, তদন্ত কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিনসহ জেলা গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তারা সমন্বিতভাবে এ মামলার তদন্ত শুরু করেন। তদন্তে পুলিশ ঘটনাস্থল ও আশপাশ থেকে বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করে এবং প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।
তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনার পর ব্যবহৃত একটি অটোরিকশার চালককে শনাক্ত করা হয়। তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করে পুলিশ সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে। পুলিশের বিভিন্ন টিম মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ ও সিলেট এলাকায় অভিযান চালায়। অবশেষে শ্রীমঙ্গল উপজেলার লইয়ারকুল গ্রামের বাসিন্দা সুহেল মিয়ার ছেলে জুহেল মিয়া ওরফে জুয়েল ওরফে আলিফকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তার হাতে ব্যান্ডেজ থাকায় তাকে চিহ্নিত করতে সুবিধা হয়। ১৭ আগস্ট দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে পুলিশ তাকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত জুহেল মিয়া স্বীকার করেছে যে, সে পূর্বে একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করত। বর্তমানে বেকার ও হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিল। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। দিনমজুর বাবার আয়ে সংসার চলতো না। অর্থকষ্ট মেটাতে সে ছিনতাইয়ের পথ বেছে নেয়। জুহেল জানায়, ৬ আগস্ট সে শহরে এসেছিল কিন্তু সুবিধাজনক সুযোগ না পেয়ে ফিরে যায়। পরদিন ৭ আগস্ট বিকেলে আবার শহরে এসে কুসুমবাগ এলাকায় নামে এবং শমশেরনগর রোডের দিকে হাঁটতে থাকে। পথে দোকানপাট লক্ষ্য করতে করতে সে “দি নিউ আরপি হার্ডওয়ার” থেকে দুটি এলবো ও একটি সাসপেনশন গ্লু ক্রয় করে কিছুক্ষণ অবস্থান করে। তবে সেখানে লোকজন বেশি থাকায় সুযোগ না পেয়ে পাশের এফ রহমান ট্রেডিং দোকানে প্রবেশ করে।
তদন্তে জানা যায়, ঘটনার সময় রুবেল মিয়া নামাজে ছিলেন। নামাজ শেষে একা দোকানে ফিরলে আসামি ক্রেতা সেজে দোকানে ঢুকে রঙ কেনার অজুহাতে ভেতরে নিয়ে যায়। সুযোগ বুঝে সে ধারালো ছুরি দিয়ে রুবেল মিয়াকে আঘাত করে। বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে এলোপাতাড়ি আঘাত করে হত্যা করে এবং দোকানের ক্যাশ বাক্স থেকে মাত্র ১ হাজার ১০০ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
আসামির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি, মাস্ক, জুতা, দুটি এলবো, একটি সাসপেনশন গ্লু, রিকশাচালককে প্রদত্ত রক্তমাখা ২০ টাকার নোট এবং দোকানের ক্যাশ কাউন্টার থেকে রক্তমাখা একটি ফাইল উদ্ধার করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হবে।