বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আজ শারীরিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ; দীর্ঘদিনের জটিল শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে তাকে বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে এবং চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। তার এই শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে শুধু বিএনপি নয়, পুরো দেশেই এক ধরনের উৎকণ্ঠা ও আবেগ তৈরি হয়েছে, কারণ তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়ের নাম।
আজকের এই অসুস্থতা আসলে একটি প্রজন্মের স্মৃতিবহ রাজনীতির সঙ্গে আমাদের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কের প্রতিফলন—স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, নির্বাচনী রাজনীতি, নারীর নেতৃত্ব—সবখানেই তার পদচারণা গেঁথে আছে। এ কারণে তার সুস্থতা এখন কেবল একজন নেত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনিবার্যতা।
শৈশব থেকে আপোষহীন পথচলা
ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া শৈশবে “পুতুল” নামে পরিচিত ছিলেন; পরবর্তীতে পরিবার নিয়ে দিনাজপুরে স্থায়ী হয়ে সেখানেই বেড়ে ওঠেন। ১৯৬০ সালে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও পরবর্তী রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যেখান থেকে তার রাজনৈতিক জীবনধারার ভিত্তি তৈরি হয়।
স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তিনি হঠাৎ করেই জাতীয় রাজনীতির অগ্রভাগে চলে আসেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে ধীরে ধীরে চূড়ান্ত নেতৃত্বে পৌঁছান। ১৯৮৪ সালে বিএনপি’র চেয়ারপারসন হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন, যা নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আপোষহীন নেত্রী
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ে বেগম খালেদা জিয়া রাজপথে লাগাতার কর্মসূচি, নির্বাচন বর্জন, গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে প্রথম সারির প্রতীক হয়ে ওঠেন। ১৯৮৬ সালের জোলমালেও অনেকে যখন আপসের পথে গিয়েছেন, তখন তিনি নির্বাচন বর্জন করে সরাসরি গণরাস্তায় অবস্থান নেন—এই দৃঢ় অবস্থানের কারণেই দেশবাসী তাকে “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবে অভিহিত করতে শুরু করে।
তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাতদলীয় জোট ও ছাত্ররাজনীতির সংগঠিত শক্তি শেষ পর্যন্ত সামরিক একনায়কতন্ত্রের পতনের পথ তৈরি করে, যার ফলশ্রুতিতে দেশে পুনরায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। এই সময়ের আন্দোলন, গ্রেফতার, গৃহবন্দিত্ব এবং নির্যাতনেও তিনি নীতিগত অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি—এটাই তার আপোষহীন চরিত্রের রাজনৈতিক সারাংশ।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী: নারীর নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং প্রথমবারের মতো কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করেন। এরপর ২০০১ সালে আবারও বিপুল জনসমর্থনে ক্ষমতায় ফিরে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন, যা বিশ্ব রাজনীতিতেও একটি বিরল অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
তার শাসনামলে শিক্ষা, নারীশিক্ষা প্রসার, গ্রামীণ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পোশাকশিল্প, প্রবাসী কল্যাণ, শান্তিরক্ষা মিশনসহ নানা খাতে নানা ধরনের সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালু হয় বলে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রামাণ্য উৎসে উল্লেখ আছে। নারীর ক্ষমতায়ন, বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য বৃত্তি ও ‘ফুড ফর এডুকেশন’ ধরনের কর্মসূচি তার সময়েই জাতীয় পর্যায়ে বড় আকারে এগিয়ে যায়।
জনমানসে জনপ্রিয়তা ও ‘জাতীয় নেত্রী’ ইমেজ
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কঠিন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া সব সময় গণতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বাসী ও ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন। তার শাসনামল, বিরোধী দলীয় জীবন ও জনসংযোগ—সব মিলিয়ে তিনি ধীরে ধীরে শুধু একটি দলের নয়, একটি সময়ের “জাতীয় নেত্রী” বা জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবেও আলোচিত হয়েছেন।
অনেক বিশ্লেষক তাকে ‘unifying character’ এবং ‘leader beyond BNP’ বলে উল্লেখ করেছেন—অর্থাৎ বিরোধী দল ও মতাদর্শের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের বড় সংকটে তিনি অনেকসময় সমঝোতা ও জাতীয় ঐক্যের কণ্ঠ হয়ে উঠেছেন। তার এই গ্রহণযোগ্যতা নিঃসন্দেহে চার দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ধৈর্য, কৌশল ও জনগণের সঙ্গে গভীর যোগাযোগের ফল।
বর্তমান শারীরিক অবস্থা: একটি জাতীয় মানবিক প্রশ্ন
দীর্ঘস্থায়ী হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে ভুগতে ভুগতে বেগম খালেদা জিয়া এখন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছেন; সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কয়েক দফা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে আইসিইউ–সমমানের পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যে, তার শারীরিক অবস্থা জটিল ও নাজুক; নিয়মিত চিকিৎসা, উন্নত সেবা ও ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বিএনপি নেতৃত্ব, তার পরিবার এবং অসংখ্য সমর্থক দেশের সর্বত্র মসজিদ-মাদরাসা, মন্দির–প্যাগোডা, সামাজিক সভা ও ব্যক্তিগতভাবে তার সুস্থতার জন্য দোয়া ও প্রার্থনা আয়োজন করছে। দলীয় নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন—বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম, মফস্বল ও শহরে কোটি কোটি মানুষ আজ ‘ম্যাডাম’-এর শারীরিক সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছে, যেন তিনি আবারও সুস্থ শরীরে তাদের মধ্যে ফিরে আসতে পারেন।
কেন তার সুস্থতা ও দলে ফিরে আসা এখন জরুরি
বর্তমান রাজনৈতিক উত্তরণের এই সংবেদনশীল সময়ে খালেদা জিয়ার শারীরিক সুস্থতা ও সক্রিয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনকে অনেক বিশ্লেষক বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংলাপ ও সমঝোতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তারা মনে করছেন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, আপোষহীন কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ঐক্য গড়ার সক্ষমতাসম্পন্ন এই নেত্রীর উপস্থিতি রাজনৈতিক মেরুকরণ কমিয়ে গণতান্ত্রিক পথে অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
রাজপথের সংগ্রামী নেত্রী থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী—এই পথচলার অভিজ্ঞতা তাকে শুধু বিএনপির মাঝেই নয়, বৃহত্তর জাতীয় পরিসরেও এক প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী ও নীতি–নির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাই তার সুস্থ হয়ে দলে ফিরে আসা, কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়া ও জাতিকে সামনে রেখে দিকনির্দেশনা দেওয়া—গণতন্ত্র, নির্বাচন ও জাতীয় ঐক্যের ভবিষ্যতের জন্য অনেকের চোখে এক অপরিহার্য শর্ত।
কোটি মানুষের দোয়া: মায়ের মতো আপন
দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ সমর্থকদের চোখে বেগম খালেদা জিয়া আজ “গণতন্ত্রের মা”, “মাদার অব ডেমোক্রেসি”, “জাতীয় মা” ইত্যাদি ভালোবাসার উপাধিতে ভূষিত—যা গণমানুষের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। সাম্প্রতিক অসুস্থতার প্রেক্ষাপটে দলীয় সিদ্ধান্তে দেশব্যাপী জুমার নামাজের পর দোয়া মাহফিল, মোনাজাত, মিলাদ ও বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে তার আরোগ্য কামনায় প্রার্থনা আয়োজন করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত ও দলীয় সোশ্যাল মিডিয়া, লিফলেট, পোস্টার থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকান পর্যন্ত—সব জায়গায় একটাই প্রার্থনা উচ্চারিত হচ্ছে: “আল্লাহ যেন আমাদের আপোষহীন নেত্রীকে সম্পূর্ণ সুস্থতা দান করেন এবং তিনি যেন দ্রুত আমাদের মাঝে সুস্থ শরীরে ফিরে আসেন।” এই কোটি কণ্ঠের দোয়া–প্রার্থনা প্রমাণ করে, তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন, বরং অনেকের কাছে মায়ের মতো আপন এক আশ্রয়ের নাম।
মানবিকতার জয়ধ্বনি
আজ বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও জাতীয় ঐক্য—সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অতীতের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন; এই প্রেক্ষাপটে আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়া অনেকের কাছে আশাবাদের এক প্রতীক। প্রবীণ এক নেত্রীর জন্য কোটি মানুষের এই দোয়া–প্রার্থনা আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও মানবিকতা সব কিছুর ওপরে—একজন অসুস্থ নারী, দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কোটি মানুষের হৃদয়ের নেত্রী হিসেবে তার সুস্থতা এখন জাতীয় ঐক্যেরও একটি নৈতিক দাবি।
শাহাব উদ্দিন আহমদ 












