মৌলভীবাজার ০৭:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইতিহাসের ঐতিহাসিক বিদায়: বেগম খালেদা জিয়ার চিরবিদায়

বেগম খালেদা জিয়া, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির অটল নেত্রী, চিরবিদায় নিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে, যেখানে বিএনপির নেতৃত্বহীনতা এবং আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নতুন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তাঁর চলে যাওয়া গণতন্ত্রের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার সূচনা।

রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার মহান পরিস্থিতি

সরকার ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে এবং জানাজার দিন সারাদেশে ছুটি দেয়। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকে এবং বিএনপি ৭ দিনের শোক পালন করে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা আদায় করা হয়। জনতার অশ্রুসিক্ত সমুদ্র এবং প্রার্থনার দৃশ্য দেশকে একত্রিত করে, কিন্তু পটভূমে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অমর গাথা

তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অক্লান্ত সংগ্রাম। সাতবার কারারুদ্ধ হয়েও সাত-দলীয় জোট গঠন করে ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন, যা স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটায়। ১৯৯১-এ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে দ্বি-দলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১-০৬) চার-দলীয় জোটের মাধ্যমে দেশকে স্থিতিশীল করেন। এই সংগ্রাম বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক বিপ্লবের স্থপতি

শাসনামলে অর্থনীতি ছুটে যায়—জিডিপি ৬% ছাড়িয়ে যায়, ভ্যাট সংস্কার চালু হয় এবং বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। ব্রিজ, সড়ক এবং পরিবহন খাতের সম্প্রসারণ দেশের অবকাঠামোকে আধুনিক করে। এসব অর্জন সংকটকালীন রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার উদাহরণ।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কালজয়ী অবদান

ফুড-ফর-এডুকেশন প্রোগ্রাম চালু করে দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করেন এবং মেয়েদের মাধ্যমিক স্কলারশিপের মাধ্যমে মেয়েদের শিক্ষা হার বাড়ান। স্বাস্থ্যে ইপিআই সম্প্রসারিত করে শিশুমৃত্যুর হার কমান। আরএমজি খাতে ২৯% কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে লক্ষাধিক মহিলাকে স্বনির্ভর করান। এই উদ্যোগগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সমাজের ভিত্তি মজবুত করেছে।

কারাবাসের মধ্যেও অটুট নেতৃত্ব

২০০৮ থেকে বিভিন্ন মামলায় কারারুদ্ধ হয়েও বিএনপিকে একত্রিত রাখেন। দীর্ঘ কারাবাস সত্ত্বেও দলের নেতৃত্ব ছাড়েননি, যা বর্তমান সংকটে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক সংকটের নতুন মাত্রা

তাঁর মৃত্যু বিএনপিকে নেতৃত্বহীন করে দিয়েছে, যা আসন্ন নির্বাচন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল এগোবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই শূন্যতা দ্বি-দলীয় ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে এবং নতুন জোটগুলোর উত্থান ঘটাতে পারে।

বিশ্বব্যাপী শোক ও প্রশংসা

বিশ্ব নেতারা শোক প্রকাশ করেন: ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ‘প্রভাবশালী নেত্রী’ বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ‘বন্ধু দেশের শক্তি’ বলে উল্লেখ করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনুস এবং অন্যান্য নেতারা শ্রদ্ধা জানান। এসব বার্তা সংকটকালে দেশের মর্যাদা বাড়িয়েছে।

পরিবারীক স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ দিগন্ত

তারেক রহমান আবেগঘন বার্তায় বলেন, “মা আমাদের চিরসঙ্গী।” বিএনপির নেতৃত্ব তারেকের হাতে যুক্ত হয়েছে, যা সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর উত্তরাধিকার—গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং মহিলা শক্তি—চিরকাল জ্বলজ্বল করবে এবং রাজনৈতিক সংকটের সমাধানের পথ দেখাবে। এই বিদায় দেশকে একত্রিত করে নতুন আশার আলো দেখিয়েছে।

ইতিহাসের ঐতিহাসিক বিদায়: বেগম খালেদা জিয়ার চিরবিদায়

আপডেট সময় ০৫:৩৮:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

বেগম খালেদা জিয়া, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির অটল নেত্রী, চিরবিদায় নিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে, যেখানে বিএনপির নেতৃত্বহীনতা এবং আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নতুন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তাঁর চলে যাওয়া গণতন্ত্রের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার সূচনা।

রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার মহান পরিস্থিতি

সরকার ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে এবং জানাজার দিন সারাদেশে ছুটি দেয়। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকে এবং বিএনপি ৭ দিনের শোক পালন করে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা আদায় করা হয়। জনতার অশ্রুসিক্ত সমুদ্র এবং প্রার্থনার দৃশ্য দেশকে একত্রিত করে, কিন্তু পটভূমে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অমর গাথা

তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অক্লান্ত সংগ্রাম। সাতবার কারারুদ্ধ হয়েও সাত-দলীয় জোট গঠন করে ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন, যা স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটায়। ১৯৯১-এ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে দ্বি-দলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১-০৬) চার-দলীয় জোটের মাধ্যমে দেশকে স্থিতিশীল করেন। এই সংগ্রাম বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক বিপ্লবের স্থপতি

শাসনামলে অর্থনীতি ছুটে যায়—জিডিপি ৬% ছাড়িয়ে যায়, ভ্যাট সংস্কার চালু হয় এবং বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। ব্রিজ, সড়ক এবং পরিবহন খাতের সম্প্রসারণ দেশের অবকাঠামোকে আধুনিক করে। এসব অর্জন সংকটকালীন রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার উদাহরণ।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কালজয়ী অবদান

ফুড-ফর-এডুকেশন প্রোগ্রাম চালু করে দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করেন এবং মেয়েদের মাধ্যমিক স্কলারশিপের মাধ্যমে মেয়েদের শিক্ষা হার বাড়ান। স্বাস্থ্যে ইপিআই সম্প্রসারিত করে শিশুমৃত্যুর হার কমান। আরএমজি খাতে ২৯% কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে লক্ষাধিক মহিলাকে স্বনির্ভর করান। এই উদ্যোগগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সমাজের ভিত্তি মজবুত করেছে।

কারাবাসের মধ্যেও অটুট নেতৃত্ব

২০০৮ থেকে বিভিন্ন মামলায় কারারুদ্ধ হয়েও বিএনপিকে একত্রিত রাখেন। দীর্ঘ কারাবাস সত্ত্বেও দলের নেতৃত্ব ছাড়েননি, যা বর্তমান সংকটে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক সংকটের নতুন মাত্রা

তাঁর মৃত্যু বিএনপিকে নেতৃত্বহীন করে দিয়েছে, যা আসন্ন নির্বাচন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল এগোবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই শূন্যতা দ্বি-দলীয় ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে এবং নতুন জোটগুলোর উত্থান ঘটাতে পারে।

বিশ্বব্যাপী শোক ও প্রশংসা

বিশ্ব নেতারা শোক প্রকাশ করেন: ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ‘প্রভাবশালী নেত্রী’ বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ‘বন্ধু দেশের শক্তি’ বলে উল্লেখ করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনুস এবং অন্যান্য নেতারা শ্রদ্ধা জানান। এসব বার্তা সংকটকালে দেশের মর্যাদা বাড়িয়েছে।

পরিবারীক স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ দিগন্ত

তারেক রহমান আবেগঘন বার্তায় বলেন, “মা আমাদের চিরসঙ্গী।” বিএনপির নেতৃত্ব তারেকের হাতে যুক্ত হয়েছে, যা সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর উত্তরাধিকার—গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং মহিলা শক্তি—চিরকাল জ্বলজ্বল করবে এবং রাজনৈতিক সংকটের সমাধানের পথ দেখাবে। এই বিদায় দেশকে একত্রিত করে নতুন আশার আলো দেখিয়েছে।