স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি বলেছেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ— স্থানীয় সরকারের এই পাঁচ স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া হাইস্কুল মাঠে বৃক্ষরোপণ ও মাঠ পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, এই নির্বাচনগুলো আয়োজনে প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। জাতীয় সংসদে অনুমোদিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেই এ অর্থের সংকুলান রাখা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে কমিশনকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শ্রীমঙ্গলের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক জনপদ, যেখানে সারা বছরই হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটে। এই পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম এবং নতুন করে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী তা সরেজমিনে দেখতেই তিনি শ্রীমঙ্গল সফরে এসেছেন বলে জানান।
তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় ও সভা করে তিনি এলাকার সমস্যাগুলো শুনেছেন। বৃহত্তর সিলেটের জন্য প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার জন্য বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এই বরাদ্দে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে শ্রীমঙ্গল— বিশেষ করে পর্যটন এলাকার সড়কগুলো প্রশস্ত ও সম্প্রসারণ করে চলাচলের উপযোগী করে তোলা হবে। বর্তমান সরকার জাতীয় উন্নয়নের মূল ধারায় মৌলভীবাজারকে ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলেও তিনি জানান। এর আগে তিনি রাধানগর-মহাজিরাবাদ সড়কের চলমান নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেন।
ভিক্টোরিয়া হাইস্কুল মাঠ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মাঠে বক্তব্য দিয়ে গেছেন। মাঠটি ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, মাঠের একটি পাশে এমন মনোরম পরিবেশ গড়ে তোলা হবে, যেখানে সিনিয়র সিটিজেনরা বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারবেন।
পরে তিনি পাশের শিশু উদ্যান পরিদর্শন করেন এবং উদ্যানটি আধুনিকায়নের ঘোষণা দেন। শিশুদের বিনোদন ও মানসিক বিকাশের উপযোগী করে উদ্যানটিকে আরও সুন্দর ও আধুনিকভাবে গড়ে তোলা হবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেখানে বয়স্কসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের হাঁটাচলার জন্য ওয়াকওয়ে এবং শিশুদের খেলাধুলার সামগ্রী স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি উদ্যানটি সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা নিতে তিনি সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
সফরের অংশ হিসেবে প্রতিমন্ত্রী শ্রীমঙ্গল শহরের কলেজ রোডস্থ হরিজন পল্লীতে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য নির্মাণাধীন ৭ তলাবিশিষ্ট আবাসন ভবনের কাজ পরিদর্শন করেন। সেখানে উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সব সরকারি ভবনকে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের আওতায় আনা হবে। তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সচিবালয়ের ক্যাবিনেট ভবন থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে সব সরকারি ভবনে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে উৎপাদিত বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকারের অধীন সব প্রতিষ্ঠানকে সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আওতায় আনা হবে এবং উৎপাদিত সেই বিদ্যুৎ যেন প্রতিষ্ঠানগুলোই ব্যবহার করতে পারে, সে লক্ষ্যে অনুশাসন জারি করা হবে। ছোট অফিসগুলোতে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ছয় মাস পর পর বিদ্যুৎ বিল যাচাই করে দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এরপর প্রতিমন্ত্রী শ্রীমঙ্গল পৌরসভার কলেজ রোড এলাকার ময়লার ভাগাড় পরিদর্শন করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সার্বিক পরিস্থিতি দেখেন। তিনি বলেন, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে রয়েছে এবং শ্রীমঙ্গলে বিশেষভাবে যে কয়েকটি বিষয় দেখার জন্য তাঁকে পাঠানো হয়েছে, তার মধ্যে ময়লার ভাগাড় অন্যতম। এ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে ইতিমধ্যে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভাগাড় স্থানান্তরের জন্য পৌরসভার পক্ষ থেকে আগে একটি জায়গা নেওয়া হলেও সেখানে বসতবাড়ি গড়ে ওঠায় স্থানীয়রা আপত্তি জানাচ্ছেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে— শহর থেকে কিছুটা দূরে, পরিবেশের ক্ষতি হবে না এমন নিরাপদ সরকারি জায়গায় ময়লার ভাগাড়টি স্থানান্তর করা হবে। বিদ্যমান বর্জ্য সরিয়ে সেখানে একটি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে, যেখান থেকে জৈব সার ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্গন্ধমুক্ত এমন একটি প্রকল্প শ্রীমঙ্গলের জন্যও আলাদাভাবে নেওয়া হবে।
সফরকালে প্রতিমন্ত্রী শ্রীমঙ্গল জামে মসজিদে ৩ লাখ টাকা অনুদান প্রদান করেন এবং পুরো মসজিদকে সোলার পাওয়ারের আওতায় আনার ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি মসজিদটির একটি ইসলামিক নামকরণের জন্য মসজিদ কমিটিকে অনুরোধ জানান। পরে ইমামের মাধ্যমে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ও মরহুম আরাফাত রহমান কোকোসহ জিয়া পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।
এদিকে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবে আগমন উপলক্ষে প্রতিমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রেসক্লাবের সদস্যরা। পরে তিনি ক্লাব সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।
এসব কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাজি মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজান রহমান মিজান, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুর রহমান ময়ূন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক সরফরাজ আহমেদ সরফু, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জিয়াউর রহমান, শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুর আলম সিদ্দিকী, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক সৈয়দ আবুজাফর সালাউদ্দিন ও সদস্যসচিব রুবেল আহমেদসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
শাহাব উদ্দিন আহমদ 








