দুঃখের কথা কী আর বলবো! চার চারটা দৈনিক পত্রিকায় কাজ করে প্রায় জীবন পার করলাম। বাংলাবাজার পত্রিকা, ভোরের কাগজ, প্রথম আলো হয়ে কালের কণ্ঠ। আমি যখন কাজ শুরু করি, প্রত্যেকটাই তখনকার লিডিং কাগজ।কিন্তু গর্ব করার সুযোগ খুব বেশি পাইনি। কারণ, প্রতিটা লিডিং কাগজে দেখেছি কেবল কাজের লোকের ‘ব্লিডিং’। একটা কাগজের প্রাণসৈনিক যারা, সেই রিপোর্টারদের ব্লিডিং আরো বেশি। ‘তোরে দেখতে নারি; তোর নিউজ বাঁকা।’ ‘ওরে ভালা পাই; ওর নিউজ ভালা’- এই হলো পত্রিকার নিউজ ম্যানেজার তথা পাতিবসদের প্রধান মানদণ্ড। তবে সবারই না; বেশিরভাগের। এই মানদণ্ডের কারণে কতোই না দণ্ড দিতে হচ্ছে কতো হাউজে কতো শত রিপোর্টারকে!
কালের কণ্ঠের হায়দার আলীর নিউজ হাতে পেয়েই ‘ডট ডট ডট লেখে’ বলে ময়লার ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলে দিতে দেখেছি। আরো অনেকের বেলায় এমন ঘটেছে আমার সামনেই। পরে সেই নিউজ ময়লার ঝুড়ি থেকে তুলে নিয়ে, ঘষেমেজে বানিয়ে ওইদিনের পত্রিকায় লিড নিউজ করার অভিজ্ঞতাও আছে আমার।
প্রথম আলোয় থাকতে বরিশালের তৌফিক মারুফ একদিন ফোন করে বলে, ‘ভাই, আমি যহন নিউজ নিয়া আপনার লগে আলাপ করি, তখন কি আপনের আশেপাশে কেউ থাহে? কেউ কি শোনেটোনে?’
আমি ধমক দিয়ে বলি, ‘কেন? শুনলেই কী আর না শুনলেই কী! আমি কী চোরের মতো ফিসফিসায়ে কথা বলি? শুনতে তো পারেই। সমস্যাটা কী?’
মারুফ আর কিছু বলে না। পরে একদিন শান্ত সময়ে বলে, ‘সেদিন তো মোরে দিলেন ঝাড়ি। কিন্তু ঘটনা একডা আছে। ইদানিং আমার ভালো নিউজ ধরেটরে না। যার হাতে নিউজডা পড়ে, সেইসব ভাইয়েরা উল্টাপাল্টা বলে। কথার ধরনে বুঝি যে, আপনার উপরে হ্যারা খুব বিলা; আর আমার নিউজ আপনে ভালো কইরা ছাপেন দেইখা আমার উপরেও বিলা।’
আমি তো তাজ্জব! ভালো নিউজ ভালো করে ছাপবো না? বললাম – ‘কও কী মনু!! হেইয়ে কি সম্ভব?’
মারুফের কথায় আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই মানদণ্ডটা- আমি যার নাম দিয়েছিলাম- ‘বসদের মানডাণ্ডা’। সেই ডাণ্ডা খেয়ে মারুফের ঠাণ্ডা অবস্থা দেখে চট করে একটা দাওয়াই মনে এলো। বললাম, ‘আমার সাথে নিউজ নিয়ে কথা কওয়ারই দরকার নাই। আমি দেখতেয়াছি।’
এর পর থেকে তৌফিক মারুফের সাথে আমার কমপক্ষে দেড় বছর কথা হয়নি। কিন্তু ওর নিউজ একের পর এক আমার হাত দিয়েই গেছে। লিডও হয়েছে। মাস ছয়েক পর মারুফকে একরাতে জিজ্ঞেস করি, ‘এখন কী অবস্থা বিলা ভাইদের?’ মারুফ হেসে বলে, ‘এহন কিছু কয়টয় না দেহি।’
‘গুড, তাহলে এভাবেই চলুক। আমার লগে কিয়ের এতো কথা? কাজ হইলেই আমার চলবে।’
এরকম পাতিবসদের মানডাণ্ডাঘাতে জর্জরিত কতো রিপোর্টারকে যে আগলে রাখতে হয়েছে! একেক জনের জন্য একেক দাওয়াই। যে শুনেছে, সে রক্ষা; যে শোনেনি, সে অক্কা।
ওয়ান-ইলেভেনের সময় রাজশাহীর আনু মোস্তফার যায় যায় অবস্থা। ঢাকা থেকে আমি সশরীরে ছুটে গেছি রাজশাহীর আর্মি ক্যাম্পে। বুঁকি নিয়ে ব্যাপক নিরাপত্তাবেষ্টনী পেরিয়ে গিয়ে বসলাম কমান্ডারের সামনে। সাংবাদিক আনু মোস্তফা ও নাগরিক আন্দোলনের ডাকসাইটে নেতা জামাত খানের জন্য তদ্বির করে আসি যে, ‘ওরা ভালো। ওদের যেন ওদের কিছু না হয়।’
সাংবাদিক না, ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্র ধরে কমান্ডার আমার কথা রেখেছিলেন। কিন্তু আনু মোস্তফাকে রাখা যাচ্ছিলো না অফিসের ‘লেজ নাড়ানো’ পাতিবসদের কারণে। আনু একরাতে ফোন দিয়ে বলে- ‘আমি তো শেষ।’
‘কেন? আবার কী হয়েছে?’
সব কাহিনী জানানোর পর আনু বললো, ‘আমি কি বড় ভাইকে ফোন দেবো?’ ‘আনুর অবস্থা গেনু রে’ দেখে আমি একটা সৎ পরামর্শ দিয়ে বললাম, ‘সমস্যা তো বড় না, ছোট ভাইদের নিয়ে। বড়কে ফোন দিয়ে লাভ কী! ফোনটোন দিয়েন না।’
কিন্তু আনু শুনলো না; ফোন দিয়ে বসলো; এবং সত্যি সত্যিই প্রথম আলো থেকে মুহূর্তে নাই হয়ে গেলো।
অসম্ভব গুণী-মেধাবী কুমিল্লার রিপোর্টার নাসিরউদ্দীন, সিলেটের আহমেদ নূরকে বাদ দেয়ার কতো অপচেষ্টা! বারবারই রুখে দিই। কিন্তু শেষরক্ষা আর হয় না তাদের।
ঢাকার অফিসে নিরীহ পিয়াসের পিছে লেগেই থাকে পাতিবসেরা। প্রথম আলোয় চাকরি খাওয়ার জোগাড় করে চার দফা; কালের কণ্ঠে এখান থেকে ওখানে ফুটবল বানায় আরো চার দফা। বেচারার সাংবাদিকতার দফারফা অবস্থা। প্রতিবারই বুকে আগলে রাখি বহু কৌশলে।
সাজ্জাদ, হিমেল, রঞ্জু, রকিবুল, সাদেকের মতো অত্যন্ত মেধাবী সাব-এডিটরদের পিছে লেগেই থাকে পাতিবসেরা। নিউজ নিয়ে, প্রমোশন নিয়ে আতিপাতি করেই চলে সারাবছর। শেষে অতিষ্ঠ হয়ে ওরা দলবেঁধে চলে আসে কালের কণ্ঠে। আমার হাজারো ‘না’ শোনেই না। বুঝতে পারি লিডিং পত্রিকায় ওদের ব্লিডিংয়ের নেপথ্য। এরকম নাছোড়বান্দা ভুরি ভুরি। আমি ডাক দিলে খালি হয়ে যায় অবস্থা। কিন্তু ডাকি না। বলি ধৈর্য্য ধারণ করো। মনের মাঝে বাজে স্লোগান- ‘যা কিছু ভালো/সব খেদায় প্রথম আলো’।
কিন্তু নাছোড়েরা ছেড়ে দিয়ে প্রথম আলোর তপ্ত কড়াই থেকে এসে পড়ে কালের কণ্ঠের জ্বলন্ত চুলোয়। আহা রে জীবন! সাংবাদিকের জীবন!! কোথায় যাবে বেচারা!!! মালিক-সম্পাদকের স্বার্থখেলা, বড় বসদের চেয়ারঠেলা; পাতিবসদের অজানাজ্বালা- কাজ করে শান্তি নাই কাজের সাংবাদিকের।
কালের কণ্ঠের জয়নালের বেলায় তো আরো জঘন্য কারবার! মিরসরাই থেকে তুখোড় অনুসন্ধানী এই তরুণ রিপোর্টারকে ঢাকায় এনে বসালাম ক্রাইম সেকশনে। ওরে বাবা! শুরু হয়ে গেলো ওকে ঘিরে ‘ক্রিমিনালি’। পাতিবস-নাশপাতিবস কেউ বাদ রইলো না। সর্বনাশ করেই ছাড়লো ছেলেটার। এমন অবস্থা করলো যে, জয়নাল ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ বলে চাকরিটা ছেড়েই দিলো।
দুঃখে-ক্ষোভে-হতাশায় হাবুডুবু খেয়ে, প্রবল সংগ্রামে নিজের ব্যবসা-সংসার সফল করে, এতো বছর পর সেই জয়নাল এখন সুযোগ পেয়েছে মন খুলে ভাবার; হাত খুলে লেখার, মাথা তুলে দাঁড়াবার। পুরো মিডিয়া-জাতি আজ দেখছে এক জ্বলন্ত জয়নালকে। একের পর এক অনুসন্ধানী চমক দেখিয়ে যাচ্ছে সেই পোড় খাওয়া ছেলেটা।
অথচ এই তুখোড় রিপোর্টারকে নবীনেই নিভিয়ে দেওয়ার সে কী ঘৃণ্য চেষ্টা!
এখন তোরা কোণ্ঠে সবে বাহে?
জয়নাল তো জ্বলন্ত! আর ওদের কেউ নিভন্ত, কেউ ডুবন্ত, কেউ ফুরন্ত, কেউ বা সর্বস্বান্ত!!
আহা! কী আনন্দ!! মরুক যতো ভণ্ড, যতো অকালকুষ্মাণ্ড!!!
সরি! এভাবে বলতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু না বলেও পারি না। কী যে এক দুঃসহ-দূষিত পরিবেশ গেছে মিডিয়াপাড়ায়! একবার এক মিডিয়া হাউজের কর্ণধার আমাকে ডেকে বললেন, ‘আপনারা সাংবাদিকেরা দেখি গ্রুপিং ছাড়া থাকতেই পারেন না! অমুকের গ্রুপ. তমুকের গ্রুপ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। তো, আপনার গ্রুপ কোনটা তৌহিদ ভাই?’
মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক হলেও আমরা একে অন্যকে ভাই সম্বোধন করতাম। বললাম, ‘ঠিক ধরেছেন ভাই। আমিও গ্রুপিং করি। আমার গ্রুপটা আবার সবচাইতে বড়। তবে ওদের দেখা যায় না, শোনা যায় না, নাগাল পাওয়া যায় না। ওদের চিহ্ন মেলে কেবল ছাপা হওয়া পত্রিকার পাতায় পাতায়। দেখবেন, যে নামগুলো প্রতিদিন জ্বলজ্বল করছে পত্রিকায়, ওরাই আমার গ্রুপের সদস্য। ওরা সারাক্ষণ থাকে কাজে ব্যস্ত। চোখ-কান-নাক-মুখ বুজে ওরা শুধু কাজ করে যায়। কাজ ছাড়া আর কিছু বোঝে না। তাই ওদের কেউ দেখে না।’
কর্ণধার কী বুঝলেন, না বুঝলেন, জানি না। তারও আগে আরেক ছোট কর্ণধার আমাকে আর মুস্তাফিজ শফিকে ‘রিমান্ডে’ নিয়ে বজ্রকণ্ঠে বললেন, ‘আমি পড়ে যাবো, আপনারা শুনে যাবেন। কোনো আওয়াজ হবে না। অভিযোগ নম্বর এক.- আপনি, মিস্টার তৌহিদুর রহমান, আপনার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে গ্রাম থেকে রিপোর্টার ধরে এনে ঢাকায় চাকরি দিয়েছেন। নরসিংদী থেকে হায়দার আলী,, বরিশাল থেকে তৌফিক মারুফ, পাবনা থেকে ফারুক আহমেদ চৌধুরী, আরো আছে…. ।’
এই গুরুগম্ভীর পরিবেশেই একফাঁকে উঁকি দিয়ে দেখি, আমাদেরই এক কলিগের হাতেলেখা কাগজ। অভিযোগনামাটা পড়া শেষ হলে ছোট মালিক আমাদেরকে সোজা দরোজা দেখিয়ে দিলেন। আমি দাঁড়িয়ে মুখ খুলতে যাবো, এমন সময় পাঁচটনি ধমক- ‘বলেছি না! কোনো কথা নাই!! গেট আউট!!!’
যেতে যেতেই ঘাড় ঘুরিয়ে আমার মুখ দিয়ে সশব্দে বেরোলো- ‘কিছু না বললে অভিযোগ মেনে নেওয়া হবে। ছয় মাসের মধ্যে প্রমাণ হবে- কোন স্বার্থে ওদের ঢাকায় এনেছি’- বলে গটগট করে বেরিয়ে এলাম রুম থেকে।
প্রমাণ হতে ছয় মাসও লাগলো না। হায়দার ঝাড়লো তার ‘বিরল ভালোবাসা’র বোমা। মারুফ দেখালো- তার বিটে সে-ই সেরা। সবার মুখ বন্ধ; অনেকের মুখ কালা।
আমার গল্পটি ফুরালো; নটে গাছটি মুড়ালো…。
তবে দিনবদল হচ্ছে দিন দিন। আমারই ‘গ্রুপের’, আমারই সমমনা নেতা-সদস্যরা ধীরে ধীরে দখল নিচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়া হাউজের চেয়ার। নিরেট ভদ্রলোক মুস্তাফিজ শফি এখন দেশ রূপান্তরের সম্পাদক; দুর্ধর্ষ অনুসন্ধানী রিপোর্টার হায়দার আলী- কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক; সাড়া জাগোনো ক্রাইম রিপোর্টার কামরুল হাসান- আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক; শাহেদ মুহাম্মদ আলী- সমকালের সম্পাদক; মোস্তফা মামুন- আগামীর সময়ের সম্পাদক; সালাহউদ্দিন- ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক; শামীমুল হক- মানবজমিনের নির্বাহী সম্পাদক; এরকম আরো কতোজন! টেলিভিশন-অনলাইন নিউজ পোর্টালেও ছড়িয়ে আছেন অনেকে, গুরুত্বপূর্ণ সব পদে। এরা সবাই কাজপাগল প্রতিভাবান মেধাবী সাংবাদিক। নিশ্চয়ই তাদের হাউজে সত্যিকারের কাজের ছেলেমেয়েরা কাজ সেরে চোখ তুলে দেখবে না- ভাগবাটোয়ারা সব শেষ। মাংস-রুটি নিয়ে গেছে বান্দরেরা। আর ওদের ভাগে জুটছে শুধু- আরো বেশি কাজ।
তপ্ত কড়াই বা জ্বলন্ত চুলায় ‘আগুনের দিন শেষ হয়ে’ ‘একদিন স্বপ্নের দিন’ আসবেই- বসে আছি এই আশায়। সেই সুদিন আগত প্রায়। আমার দিন আসছে মিডিয়াপাড়ায়- এ আশা তো করাই যায়, সম্পাদক মহোদয়?
তৌহিদুর রহমান
বিশিষ্ট সিনিয়র সাংবাদিক
তৌহিদুর রহমান 












