মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমানের অভিযোগ, স্বাস্থ্য খাতে বিপুল বরাদ্দের অর্থের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে দরপত্র ছাড়াই ১ কোটি ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ তুলে তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দেশের স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি, অর্থের অপব্যবহার ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম নাসের রহমান। তাঁর অভিযোগ, স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনায় এমন দুর্বলতা রয়েছে, যার কারণে সরকারি অর্থের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিকে তিনি ‘মাদার অব অল দুর্নীতি’ বলে অভিহিত করেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে কুলাউড়া শহরের মেরিনা স্কয়ারের দ্বিতীয় তলায় মেরিনা ইয়াসমিন চৌধুরী ফিজিওথেরাপি সেন্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন নাসের রহমান। তাঁর বক্তব্য, বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের উদাহরণ বিবেচনায় নিলে এর উল্লেখযোগ্য অংশ দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে জনগণের কল্যাণে যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রাথমিক পর্যায়ের হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরাজীর্ণ অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৫৯ হাজার কোটি টাকা, নাকি ৬০ হাজার কোটি টাকা—এ বিষয়ে বক্তব্যে উল্লেখ করে তিনি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেন।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে দরপত্র ছাড়াই ১ কোটি ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ তুলেছেন নাসের রহমান। তাঁর দাবি, গত সপ্তাহে তিনি এ-সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়টি শনাক্ত করেছেন। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) যৌথভাবে ওই অর্থ উত্তোলন করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাসের রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি তদন্তে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তদন্ত করছে।
তবে অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়া, দরপত্র না হওয়ার কারণ, অর্থের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়ম চলে আসছে বলে অভিযোগ করেন নাসের রহমান। এ বিষয়ে আগের সরকারগুলোর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার ব্যবস্থাপনা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণে এ খাতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরির কথাও জানান তিনি।
নাসের রহমানের মতে, স্বাস্থ্য খাতের অনিয়মের ব্যাপকতা চিহ্নিত করে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তবে তাঁর উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।
দেশের হাসপাতালগুলোর পরিচ্ছন্নতা, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন নাসের রহমান। সাম্প্রতিক একটি হাসপাতাল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি হাসপাতালের টয়লেট ব্যবহার অনুপযোগী থাকা এবং চিকিৎসকের কক্ষে ধূমপানের মতো ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; হাসপাতালের পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, অবকাঠামো এবং চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতের সমস্যার ব্যাপকতা বোঝাতে গিয়ে তিনি এর সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্য, সমস্যার পরিধি এতটাই বিস্তৃত যে কার্যকর উদ্যোগ ও ধারাবাহিক তদারকি ছাড়া তা সমাধান করা কঠিন।
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান নাসের রহমান। তিনি বলেন, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের আওতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, কুলাউড়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের প্রতিষ্ঠান সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অর্জন সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আজম জে চৌধুরী জানান, আগে ওই স্থানে ২২ বছর ধরে একটি ক্লিনিক চালু ছিল। পরে সেটিকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রূপান্তর করা হয়, যাতে মানুষ আধুনিক চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের হেড অব সিএসআর কর্নেল (অব.) লিয়াকত আলী খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মৌলভীবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. জাকির হোসেন ও কুলাউড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি এম শাকিল রশীদ চৌধুরী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের পরিচালক দিলরুবা চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ চৌধুরী, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এম এ মুকিত ও মো. ফখরুল ইসলামসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোট: প্রকাশের আগে হাসপাতাল থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ, তিনটি তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য, দুদকের তদন্তের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের সঠিক পরিমাণ ও অনুষ্ঠানের তারিখ নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত।







