শ্রীমঙ্গলে সাংবাদিক এহসানকে অস্ত্রধারী যুবকের অনুসরণের অভিযোগ, থানায় জিডি
অনলাইন ভার্সন

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে রাতে বাসায় ফেরার পথে অস্ত্রধারী এক মোটরসাইকেল আরোহীর অনুসরণের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক মো. এহসানুল হক, যিনি এহসান বিন মুজাহির নামেও পরিচিত। এ ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে শ্রীমঙ্গল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি। শনিবার (১৭ অক্টোবর) করা জিডির নম্বর ১০৮৭।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে শনিবার রাত ৮টায় শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবে জরুরি সভা আহ্বান করা হয়।
এহসানের অভিযোগ, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ১১টা ২৫ মিনিটে শহরের কালিঘাট রোড থেকে মোটরসাইকেলে করে মুসলিমবাগ এলাকায় নিজ বাসার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। মুসলিমবাগের সড়কে প্রবেশের পর ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের একটি মোটরসাইকেলে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবক তাঁকে অনুসরণ করতে থাকেন। মোটরসাইকেলটির সম্ভাব্য নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ল-১২৮৩ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এহসানের ভাষ্য, তিনি মোটরসাইকেলের গতি বাড়ালে বা কমালে পেছনে থাকা আরোহীও একইভাবে গতি পরিবর্তন করছিলেন। একই সময় সামনে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বসে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় তিন যুবকও তাঁকে লক্ষ্য করছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় মুসলিমবাগ এলাকায় লন্ডনপ্রবাসী তুহিন চৌধুরীর ভবনের সামনে মোটরসাইকেল থামান এহসান। এ সময় তাঁর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মাহমুদুল হাসান নাঈম ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এহসান তাঁকে বিষয়টি জানান।
এহসানের অভিযোগ, মোটরসাইকেল আরোহী ইঞ্জিন বন্ধ করে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ভঙ্গিতে তাঁদের ওপর নজর রাখছিলেন। পরে বিপদের আশঙ্কায় মোটরসাইকেলের হেডলাইট বন্ধ করে একটি অন্ধকার গলি দিয়ে বাসায় পৌঁছান তিনি।
শিক্ষক মাহমুদুল হাসান নাঈমের দাবি, অজ্ঞাতপরিচয় ওই যুবকের কোমরের বাঁ পাশে বেল্টের সঙ্গে একটি পিস্তল গোঁজা ছিল। তাঁর ধারণা, যুবকটি সাংবাদিক এহসানকেই অনুসরণ করছিলেন। তবে অস্ত্রের উপস্থিতি ও অনুসরণের অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “জিডির আবেদনটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ওই সশস্ত্র যুবককে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের টিম কাজ করছে।”
সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান। ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি জানান, দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য থানার ওসির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) সঙ্গেও আলোচনা করা হবে।
এহসান বিন মুজাহির দীর্ঘদিন ধরে মাদক, অনিয়ম ও দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করে আসছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে এর আগেও একাধিকবার হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ তাঁর।
এহসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট মাদকবিরোধী সংবাদ প্রকাশের জেরে তাঁর বাসভবনের প্রধান ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। এ ঘটনায় শ্রীমঙ্গল থানায় করা জিডির নম্বর ১৩৫৩।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর উপজেলার কালিঘাট চা-বাগান এলাকায় পেশাগত কাজে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে তাঁকে অনুসরণ করে হামলার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। ওই ঘটনার জিডির নম্বর ১৫২৯।
২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নো ক্যাপশন’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁকে হত্যার পর লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন এহসান। এ ঘটনায় করা জিডির নম্বর ১২৮০।
এহসানের দাবি, আগের ঘটনাগুলোতে পৃথক জিডি করা হলেও কার্যকর প্রতিকার পাননি তিনি। তাঁর অভিযোগ, আগের ঘটনাগুলোর যথাযথ প্রতিকার না হওয়ায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তবে আগের অভিযোগগুলোর তদন্ত ও আইনগত অগ্রগতির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এ প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।
শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক সৈয়দ সালাউদ্দিন বলেন, “পেশাদার ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকের ওপর এভাবে নজরদারি চরম উদ্বেগের বিষয় এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত।”
সাংবাদিক এহসান বিন মুজাহির ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্ত যুবককে শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন মহল।
ঘটনার নেপথ্যে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।
ঘটনার প্রকৃত কারণ, মোটরসাইকেল আরোহীর পরিচয় এবং অভিযোগে উল্লেখ করা অস্ত্রের বিষয়ে তদন্তের ফল পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।








