চা বাগানের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এবার তুলা চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উপজেলার শিববাড়ি সাইটুলা গ্রামের কৃষক তাপস কুর্মী প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে তুলার আবাদ করেছেন, যার মধ্যে চার বিঘায় ভালো ফলন এসেছে। চা-প্রধান এ অঞ্চলে অপ্রচলিত এই ফসলের এমন ফলনকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। খেতজুড়ে গাছে গাছে ফুটে থাকা সাদা তুলা দেখতে ভিড় করছেন আশপাশের কৃষকেরাও, তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।
শ্রীমঙ্গলে তুলা চাষ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করা স্টোর কাম ফিল্ডম্যান সুকদেব রায় জানান, পাশের জমিতে সবজি চাষের প্রভাবে তাপস কুর্মীর তুলা খেতের একটি অংশে ফলন আশানুরূপ হয়নি। তবে বাকি চার বিঘা জমিতে ফলন ভালো হয়েছে, যা এলাকায় নতুন ধরনের চাষ হিসেবে উল্লেখ করার মতো।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভালো ফলন হওয়া চার বিঘা জমি থেকে বিঘাপ্রতি গড়ে প্রায় ১০ মণ হিসেবে মোট ৪০ মণের মতো তুলা পাওয়া যাবে। সুকদেব রায়ের তথ্যমতে, এই চাষে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। উৎপাদিত তুলা বিক্রি করে কৃষক প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা আয় করতে পারবেন বলে তিনি আশা করছেন।
সুকদেব রায় আরও জানান, এর আগে কৃষককে কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই তাঁর অফিসের মাধ্যমে কৃষকের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় তুলা চাষ সম্প্রসারণে তিনি কাজ করছেন এবং কৃষকদের মধ্যে এ ফসলের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
দেশের চায়ের রাজধানী হিসেবে খ্যাত শ্রীমঙ্গলেই বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অবস্থান। চা বাগানের বাইরে এখানকার কৃষকেরা প্রধানত ধান ও সবজি চাষের ওপর নির্ভর করেন। এমন একটি এলাকায় তুলার সফল আবাদ স্থানীয় কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশে তুলার চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। স্বাধীনতার পর বস্ত্রকলগুলোতে তুলার সংকট দেখা দিলে ১৯৭২ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠন করা হয় তুলা উন্নয়ন বোর্ড। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত বোর্ড তুলার নয়টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এরপরও দেশের সুতা কারখানাগুলোর মোট চাহিদার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ তুলা দেশে উৎপাদিত হয়।
তুলা উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে বছরে প্রায় ৯০ লাখ বেল (গাঁট) কাঁচা তুলার প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে আনুমানিক ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৪৫ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৪২১ বেল। আমদানিনির্ভরতা কমাতে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে ১৯ লাখ বেল তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার।
তুলা দীর্ঘমেয়াদি ফসল হলেও ভালো লাভ ও সরকারি প্রণোদনার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকেরা এখন বাণিজ্যিকভাবে তুলা চাষে ঝুঁকছেন। দেশে উৎপাদন বাড়লে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রাও।
এ প্রেক্ষাপটে চা-নির্ভর শ্রীমঙ্গলে তাপস কুর্মীর উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অন্য কৃষকেরাও তুলা চাষে আগ্রহী হবেন এবং স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।








