টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজানে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চলতি জুলাই মাসে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে মৌলভীবাজার জেলা। মনু ও ধলাই নদীর একাধিক প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে সদর, রাজনগর, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ—এই চার উপজেলার অন্তত ১৭টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ পানিতে তলিয়ে যায়। পানিবন্দি হয়ে পড়েন হাজারো মানুষ, তলিয়ে যায় সড়ক ও ফসলের মাঠ, ভেঙে পড়ে একটি কালভার্ট এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা। সপ্তাহখানেকের এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন নদীতীরবর্তী কৃষক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে অবশ্য কিছুটা স্বস্তির খবর মিলছে। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, শনিবার সকাল থেকে জেলার মনু, ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানি আগের তুলনায় অনেকটাই কমতে শুরু করেছে এবং নতুন করে অতি ভারী বৃষ্টিপাত না হলে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা নেই। পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ পরিমাপে মনু নদীর পানি রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে বিপৎসীমার প্রায় ১৯০ সেন্টিমিটার, ধলাই নদীর পানি ২৬২ সেন্টিমিটার এবং জুড়ী নদীর পানি ২২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অথচ মাত্র কয়েক দিন আগেও এসব নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপর দিয়ে বইছিল।
বন্যার সূচনা হয় জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে। বুধবার ভোর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি টানা দুই দিন অব্যাহত থাকে; জেলা সদরসহ সাতটি উপজেলায় থেমে থেমে ভারী বর্ষণ হয়। উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে চব্বিশ ঘণ্টায় ২২৪ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি রেকর্ড হওয়ায় পাহাড়ি ঢলের চাপে জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। ৯ জুলাই সকালে মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার এবং ধলাই নদীর পানি ৩৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। পরদিন পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে—মনু নদীর চাঁদনীঘাট অংশে পানি বিপৎসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার এবং কুশিয়ারা নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার ওপরে উঠে যায়। ফলে জেলার তিনটি প্রধান নদী—মনু, ধলাই ও কুশিয়ারা—একযোগে বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায় এবং সঙ্গে জুড়ী নদীর পানিও বাড়তে থাকে।
পানির চাপে একের পর এক প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে পড়ে। কমলগঞ্জ উপজেলায় সীমান্তবর্তী মখাবিল এলাকায় ধলাই নদীর বাঁধ বুধবার রাতে ভেঙে গেলে ইসলামপুর, আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। বিশেষ করে মখাবিল ও গঙ্গানগর এলাকায় বাঁধের বড় অংশ ধসে পড়ায় তীব্র গতিতে লোকালয়ে পানি ঢুকতে থাকে, তলিয়ে যায় ইসলামপুর-আদমপুর প্রধান সড়ক। অন্যদিকে রাজনগর উপজেলায় মনু নদীর উজিরপুর ও পরে একামধু এলাকায় এবং কুলাউড়ার শিকরিয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে টেংরা ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম পানিতে ডুবে যায়। রাজনগরে মনু নদীর ভাঙনে টেংরা, কামারচাক, মনসুরনগর ও পাঁচগাঁও, কুলাউড়ায় জয়চণ্ডী, সদর, হাজীপুর ও শরীফপুর এবং সদর উপজেলায় মনুমুখ, কামালপুর, আখাইলকুড়া, চাঁদনীঘাট, কনকপুর ও পৌর এলাকা প্লাবিত হয়।
জেলা প্রশাসন ও পাউবো সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলায় প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ মানুষ ও ৪ হাজার ১৭৫টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মৌলভীবাজারের চার উপজেলায় সব মিলিয়ে ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকে উঁচু স্থানে ও আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটেছেন; কেউ কেউ গবাদিপশু নিয়ে সড়ক ও বাঁধের ওপর ঠাঁই নিয়েছেন। বিশুদ্ধ খাবার পানি, রান্নার সুযোগ ও শৌচব্যবস্থার সংকটে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পানিবন্দি মানুষজন।
এই দুর্যোগে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। রাজনগর উপজেলার আকুয়া এলাকায় রিং বাঁধের পাশ থেকে আশরাফ আলী নামের এক বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা; একই দিন বিকেলে টেংরা ইউনিয়ন থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি হিসাবে মৌলভীবাজারে বন্যায় একজনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এবারের বন্যা ও পাহাড় ধসে দেশের সাতটি জেলায়—সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানে—১০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
বন্যায় সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে কৃষিতে। কমলগঞ্জ ও রাজনগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় সদ্য রোপণ করা আউশ ধান ও নানা জাতের শাকসবজির ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে, অনেক জমির ফসল পানির স্রোতে ভেসে গেছে। টমেটো চাষের জন্য পরিচিত কমলগঞ্জের আদমপুর এলাকায় আকস্মিক বন্যায় চাষিদের কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। নিম্নাঞ্চলের পতনঊষার-তারাপাশা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় ওই অঞ্চলের যোগাযোগও ব্যাহত হয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, পানি নেমে গেলেও পলি ও পচনের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন উদ্ধার, আশ্রয় ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৫০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে; এর আগে রাজনগর, জুড়ী, সদর ও কমলগঞ্জ উপজেলায় পর্যায়ক্রমে চালসহ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। জেলাজুড়ে দেড় শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং দুর্গত পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে; দুর্গতদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ জানান, জেলার নদীগুলোর পানি অনেকটাই কমেছে এবং পানির চাপও ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে; নতুন করে অতি ভারী বৃষ্টি না হলে দু-এক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলো দ্রুত মেরামতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান। তবে ধলাই নদীর মখাবিল অংশের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধটি সীমান্তসংক্রান্ত জটিলতার কারণে আগে মেরামত করা সম্ভব হয়নি বলে পাউবো সূত্রে জানা গেছে; প্রতিবছর নদী ভরাট হলে ওই অংশ দিয়েই বাঁধ ভেঙে বন্যার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গত বছরের বন্যায় মনু ও ধলাই নদীর একাধিক স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেগুলোর স্থায়ী মেরামত শেষ না হওয়ায় এবারও একই জায়গা দিয়ে পানি ঢুকেছে। তাই সাময়িক ত্রাণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর স্থায়ী ও টেকসই সংস্কারই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষ।
শাহাব উদ্দিন আহমদ 









