টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচির তৃতীয় ধাপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে সুইচ টিপে তিনি এ কর্মসূচির সূচনা করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে পৌঁছানোর পর জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এদিন শ্রীমঙ্গলে দিনভর ছিল ভারী বৃষ্টিপাত। তবে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই অনুষ্ঠানস্থলে জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ। প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে দেখা যায় উপস্থিত জনতাকে।
উদ্বোধনের আগে প্রধানমন্ত্রী ১০ জন উপকারভোগীর হাতে সরাসরি ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন। অনুষ্ঠানে ১৫৫ জন ভাতাভোগীর মোবাইল ফোনে জুন মাসের ভাতার অর্থ পাঠানো হয়। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে এই অর্থ স্থানান্তর করা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম পর্যায়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫৫টি পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে চা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নানা সুবিধা প্রদান করা হয়। ৫০ জন নারী চা শ্রমিককে গৃহনির্মাণের জন্য দুই লাখ টাকা করে অনুদানের চেক, চা শ্রমিক পরিবারের ১৫০ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা সহায়তা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে কয়েকটি দুস্থ ও অসহায় পরিবারের হাতে আর্থিক অনুদানও হস্তান্তর করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে চা শ্রমিকদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালুর যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তিনি জানান, এ কর্মসূচির মাধ্যমে ধাপে ধাপে চা শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের সামাজিক সুরক্ষা ও সহায়তার আওতায় আনা হবে। বর্তমানে সবার হাতে কার্ড পৌঁছে দেওয়া সম্ভব না হলেও পর্যায়ক্রমে আগামী এক বছরের মধ্যে চা বাগানের সকল নারী শ্রমিককে এই সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য কেবল সহায়তা প্রদান নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ধরনের কর্মসূচি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
বক্তব্যে চলতি অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সমালোচকদের কড়া জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যে বাজেটের মাধ্যমে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেই বাজেটকে কেউ কেউ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন। এই বাজেটে স্বাস্থ্য খাত, কৃষকদের জন্য অর্থ বরাদ্দ এবং শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে শিল্প-কারখানা ও মিল-ফ্যাক্টরি গড়ে তুলে বেকার সমস্যার সমাধানই এই বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি জানান, দেশে উৎপাদিত পণ্য বিদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, যাতে দেশীয় মিল-কারখানাগুলো টিকে থাকতে পারে। তার ভাষ্য, কারখানাগুলো সচল থাকলে দেশের তরুণরা সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। একই পণ্য বিদেশ থেকে এলে দেশীয় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই এসব কারখানাকে সুরক্ষা দিতেই বাজেটে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, চাল, ডাল, লবণ, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর আগের শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করা হয়েছে, যাতে জিনিসপত্রের দাম না বাড়ে। জনগণের কথা বিবেচনায় নিয়ে এই বাজেটে ৬০টির বেশি পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, ৬০টির বেশি পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার করা এই বাজেটকে যারা গণবিরোধী বলছেন, তারা কি কখনো জনগণের বন্ধু হতে পারেন? জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাকারীদের ব্যাপারে—তা সংসদের ভেতরে হোক বা বাইরে—সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, একটি মহল দেশে অশান্তি সৃষ্টির সুযোগ পেলে ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। অশান্তি তৈরি হলে চলমান উন্নয়নমূলক কাজ অব্যাহত রাখা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাই উন্নয়ন কার্যক্রমে যারা বাধা সৃষ্টি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপিকে ‘জনগণের দল’ আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যতবার মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, ততবারই জনগণ ধানের শীষকে বিজয়ী করেছে। মৌলভীবাজারে রাস্তাঘাটসহ উন্নয়নমূলক কাজগুলো প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সময়ে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপির করা উন্নয়ন টিকিয়ে রাখতে হলে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
এর আগে সকালে ঢাকা থেকে সিলেটে পৌঁছে সড়কপথে শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। পথে বিভিন্ন স্থানে দলীয় নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ ও চা শ্রমিকরা তাকে স্বাগত জানান। বিশেষ করে চা বাগান অধ্যুষিত এলাকায় শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জি কে গউছ, সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী এবং সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী। এছাড়া বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্যসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও দলীয় নেতারা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। পরে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বিনিময় করে তিনি শ্রীমঙ্গল ত্যাগ করেন।
সফরসূচি অনুযায়ী, সকাল সোয়া ১০টার দিকে সিলেটে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে শ্রীমঙ্গলে পৌঁছান দুপুর ১টার দিকে। শ্রীমঙ্গলের অনুষ্ঠান শেষে দুপুর আড়াইটায় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আরেকটি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার। সেখানে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫২টি পরিবারের মধ্যে কার্ড বিতরণ করা হবে। পরে তিনি জেলার আরও কয়েকটি নির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
কর্মসূচি শেষে শ্রীমঙ্গলের দুসাই রিসোর্টে সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম শেষে একটি রাজনৈতিক সভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সভা শেষে সন্ধ্যায় ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তার। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজার জেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয় এবং সফর ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। এর আগে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে ভোটের প্রচারে মৌলভীবাজার সফর করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শাহাব উদ্দিন আহমদ 








