শিরোনামসহ সম্পূর্ণ প্যাকেজটি মুক্তবার্তা২৪.কম-এর জন্য প্রস্তুত করে দিলাম—সাহিত্যিক অথচ সংবাদধর্মী ভাষায়, তথ্য অবিকৃত রেখে, সরাসরি ওয়ার্ডপ্রেসে কপি-পেস্ট উপযোগী করে।
শিরোনাম: শিকারির হাত থেকে অভয়ারণ্যের অভিভাবক: চিরনিদ্রায় সীতেশ বাবু
উপশিরোনাম: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নিবেদিতপ্রাণ পথিকৃৎ সীতেশ রঞ্জন দেবের জীবনাবসান
বাইলাইন: শাহাব উদ্দিন আহমদ, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
যে হাত একদিন বন্দুক তুলেছিল হিংস্র প্রাণীর দিকে, সেই হাতই একসময় হয়ে উঠেছিল আহত-বিপন্ন বন্যপ্রাণীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। প্রকৃতির প্রতি সেই আজন্ম ভালোবাসার মানুষটি—দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেব আর নেই।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে ৭৫ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই প্রকৃতিসেবক। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নাতি রাজদ্বীপ দেব। তিনি জানান, সকালে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে পথিমধ্যেই থেমে যায় তাঁর জীবনের স্পন্দন।
তাঁর প্রয়াণে শ্রীমঙ্গলসহ সারা দেশের পরিবেশবাদী ও বন্যপ্রাণীপ্রেমী মহলে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের নোয়াগ্রামে সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য। প্রিয় এই মানুষটিকে শেষ বিদায় জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিক ও চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসংখ্য মানুষ। তাঁর মৃত্যুতে স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
শ্রীমঙ্গল শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাসিন্দা সীতেশ রঞ্জন দেবের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় জুড়ে ছিল বন্যপ্রাণী আর প্রকৃতির গল্প। তাঁর বাবা শ্রীশচন্দ্র দেব ছিলেন এ অঞ্চলের নামকরা শিকারি ও পশুপাখির সেবক। বাবার হাত ধরেই কৈশোরে পশুপাখি লালনপালনে হাতেখড়ি হয় সীতেশের। কালক্রমে তিনিও হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ শিকারি; বৈধ লাইসেন্সে বন্দুক ব্যবহার করে লোকালয়ে উপদ্রব সৃষ্টিকারী বহু হিংস্র প্রাণী তাড়িয়েছেন কিংবা শিকার করেছেন।
কিন্তু সেই শিকারি জীবনেই ঘটে যায় মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঘটনা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কুয়াশামোড়া এক শীতের ভোরে ধলই ভ্যালির পাত্রখলা চা বাগানের নলখাগড়ার বনে বন্য শূকর তাড়াতে গিয়ে বিশালাকৃতির এক ভাল্লুকের আক্রমণের মুখোমুখি হন তিনি। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে ভেতর থেকে আমূল বদলে দেয়। এরপর বন্দুক নামিয়ে রেখে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেই নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করেন সীতেশ রঞ্জন দেব।
আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর নিরাপদ ঠিকানা হিসেবে তিনি নিজ বাড়ির আঙিনায় ছোট পরিসরে গড়ে তোলেন একটি সেবাকেন্দ্র। পর্যটক ও দর্শনার্থীদের কাছে ‘সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই কেন্দ্রটি পরবর্তীতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় শহরসংলগ্ন খামারবাড়িতে স্থানান্তর করা হয় এবং সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে তা রূপ নেয় ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন’-এ।
গত কয়েক দশকে এই প্রতিষ্ঠান লোকালয়ে আটকে পড়া, দুর্ঘটনায় আহত কিংবা বিপন্ন হাজার হাজার বন্যপ্রাণীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছে এবং সেগুলোকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনে অবমুক্ত করেছে। পাশাপাশি বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্ধার অভিযানে নিয়মিত সহায়তা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরিতেও রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সীতেশ রঞ্জন দেব অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁর দুই ছেলে সজল দেব ও সঞ্জিত দেব বাবার আদর্শকে পাথেয় করে এই সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। স্বজনরা জানান, বাবার রেখে যাওয়া এই দায়িত্ব তাঁরা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখবেন।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, পাচার প্রতিরোধ ও পরিবেশ রক্ষায় সীতেশ রঞ্জন দেবের অসামান্য অবদান দেশের প্রকৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্টাফ রিপোর্টার 









